August 25, 2026, 1:15 pm
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠাতে হবে’। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ১৮ মাস দায়িত্ব পালনকালে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের বড় সুযোগ পেয়েও তিনি তা কাজে লাগাতে পারেননি—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। তার আমলে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব তুলে ধরা হচ্ছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন ড. ইউনূস। দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের পছন্দমতো উপদেষ্টা পরিষদ ও বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেন তিনি। বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য অভ্যুত্থান-সমর্থিত রাজনৈতিক ও ছাত্রশক্তির সমর্থনও ছিল তার প্রতি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার এনে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েসের ভাষ্য, একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু তার সময়ে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি ছাড়া অধিকাংশ সূচকই ছিল নিম্নমুখী।
২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের গড় বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা কমে দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এক বছরে প্রায় ১.৫ শতাংশ পয়েন্ট পতন—গত চার দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।
সরকারি বিনিয়োগেও ছিল বড় ধস। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হারে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। জুলাই-নভেম্বর সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন ছিল মাত্র সাড়ে ১১ শতাংশ।
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। গবেষণা তথ্যে বলা হচ্ছে, খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ অবস্থানে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সরকারি ঋণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকিং খাত থেকে ৬১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।
ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধি বেশি। ফলে কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিনির্ধারণী সুদের হার বাড়ানোয় ব্যাংকঋণ ব্যয়বহুল হয়েছে, কমেছে বেসরকারি ঋণ প্রবাহ।
অর্থনীতির নানা সূচকে দুর্বলতা থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে। বিদায়ী ভাষণে ড. ইউনূস এ অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন।
তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষক ড. লুবনা তুরীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, রিজার্ভ কোনো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; এটি একটি উপকরণ মাত্র। তার মতে, উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে শিল্প সংকোচন ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের মূল্য কতটা—সেটিই বড় প্রশ্ন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভাষণে ড. ইউনূস গণতন্ত্র সুসংহতকরণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, প্রশাসনিক ও বিচার সংস্কার এবং অবাধ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন ছাড়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।
তার আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ, উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী নিয়ে প্রশ্ন, এবং স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক-এর কর মওকুফ ও শেয়ার কাঠামো পরিবর্তন নিয়েও বিতর্ক হয়েছে।
এ ছাড়া গ্রামীণ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্রুত অনুমোদন ও বিশেষ সুবিধা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
১৮ মাস দায়িত্বে থাকলেও তিনি সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। ১১টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত ঘটনার অভিযোগও সামনে আসে।
বিশ্বজুড়ে ড. ইউনূস ‘তিন শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—ধারণা প্রচার করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের দাবি, তার শাসনামলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব উভয়ই বেড়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার পরও তিনি কি আগের মতো দৃঢ়তার সঙ্গে ‘তিন শূন্য’ দর্শনের কথা বলতে পারবেন? সচেতন মহলের আলোচনায় এখন সেটিই প্রধান প্রশ্ন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন